° ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
রাজনীতি এবং ধর্ম মানব সমাজের দুটি মৌলিক উপাদান, যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বরাবরই জটিল ও বহুমাত্রিক। বিশ্বের বহু দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, রাজনীতির ময়দানে ধর্মের প্রভাব অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম, সেখানে রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মের ব্যবহার এবং ধর্মভিত্তিক আদর্শিক রাজনীতি—এই দুটি ভিন্ন ধারণা প্রায়শই আলোচিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বরাবরই ভূমিকা রেখে এসেছে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মের ব্যবহার বহু পুরোনো। তবে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ধর্মভিত্তিক আদর্শিক রাজনীতির মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম প্রায়শই ব্যবহার হয়েছে জনমত প্রভাবিত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামকে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি ছিল মূলত রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে।
স্বাধীনতার পরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটব্যাংক সৃষ্টির জন্য ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে ধর্ম অনেক সময় বিভাজনের হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছে—যেখানে ধর্মকে আদর্শ নয়, বরং ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে দেখা গেছে।
° আদর্শিক রাজনীতি বনাম ব্যবহারিক রাজনীতি:
‘ধর্মের ব্যবহার’ বলতে বোঝায় — রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় আবেগ, প্রতীক, বা মূল্যবোধকে কাজে লাগানো। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বলতে সাধারণত রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য, ভোটের মেরুকরণের জন্য, অথবা ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আবেগ, প্রতীক এবং অনুভূতিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা বোঝায়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে পার্থিব রাজনৈতিক লাভ, আদর্শ প্রতিষ্ঠা নয়।
অন্যদিকে ‘আদর্শিক রাজনীতি’ বলতে বোঝায় —ধর্মীয় নীতিমালা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা।
° ধর্মের অপব্যবহারের স্বরূপ:
সাম্প্রদায়িক বিভাজন: ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনীতিতেও অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মকে ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা সমাজে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি করে।
আবেগকেন্দ্রিক রাজনীতি: রাজনীতিবিদরা ধর্মীয় বক্তৃতা ও স্লোগানের মাধ্যমে জনগণের আবেগ ও অন্ধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করেন।
ভোটের রাজনীতি: নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তাদের ধর্মীয় পরিচিতিকে চাঙ্গা করে ‘ব্লক ভোট’ নিশ্চিত করার প্রবণতা দেখা যায়, যা বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে: অনেক ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা মূলধারার দলও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বা ধর্মভিত্তিক দলের চাপ এড়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মকে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করে থাকে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আদর্শিক রাজনীতি: ‘নীতি’ ও ‘পরিবর্তন’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (IAB) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১৯৮৭ সালের ১৩ই মার্চ গঠিত হয়, যার মূল ভিত্তি ইসলামি আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠন।
রাজনীতিকে দলের আদর্শিক ভিত্তি এবং ইসলামী আন্দোলন এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ ফজলুল করীম (রহ.) কর্তৃক প্রবর্তিত সমন্বিত রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।
ইসলামী আন্দোলনের মূল স্লোগান—”শুধু নেতা নয়, নীতিরও পরিবর্তন চাই”—আদর্শিক রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক দর্শন মূলত তিনটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত:
১. আদর্শিক রাজনীতি — ইসলামকে জীবনের পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ।
২. নৈতিকতা ও সুশাসন — দুর্নীতি ও স্বার্থপর রাজনীতির বিরুদ্ধে নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
৩. জনসেবামূলক রাজনীতি — সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণে কাজ করা।
আইএবি’র আদর্শিক ভিত্তি ও স্বতন্ত্রতা
ইসলামী শাসনতন্ত্র: আইএবি’র মূল ভাবাদর্শ হলো ইসলামপন্থা , যা কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে খেলাফতে রাশেদার আদর্শে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখে। এই আদর্শের উৎস আল-কুরআন ও সুন্নাহ।
সমন্বিত রাজনীতি: প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ ফজলুল করীম (রহ.) সুফীবাদ (রূহানিয়াত), শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ইসলামকে সমন্বিত করে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রূহানিয়াত (আধ্যাত্মিকতা) ছাড়া রাজনীতিতে ক্ষমতার মোহ ও নীতি-আদর্শের বেচাকেনা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ব্যক্তি ও সমাজ সংশোধন: দলটি মনে করে, কেবল শাসক পরিবর্তন বা শাসনতন্ত্র পরিবর্তন দিয়ে জাতির কাঙ্খিত মুক্তি আসবে না। ব্যক্তি পরিবর্তন এবং সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিকে একত্রে করতে হবে, যেখানে ব্যক্তি সংশোধন বা গঠনের জন্য শিক্ষা ও তাসাউফের প্রয়োজন। এটি কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়, বরং সমাজবিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা।
জনমুখী দল: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদেরকে একটি গণমুখী দল হিসেবে তুলে ধরে, যারা মানুষের জান-মাল লুটপাট না করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং জনগণের আকাঙ্খিত নেতৃত্ব দিতে চায়।
উপসংহারে বলা যায়, যে কোনো রাজনৈতিক দল যখন ধর্মকে কেবল একটি হাতিয়ার বা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা সমাজে বিভেদ, ধর্মান্ধতা ও সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মতো দল যখন ইসলামী আদর্শকে নীতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি ও সমাজবিপ্লবের মাধ্যমে সার্বিক পরিবর্তনের কথা বলে, তখন তারা আদর্শিক রাজনীতির চর্চা করে। এই আদর্শিক রাজনীতি প্রচলিত নেতা ও নীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী শান্তি ও মানবিক মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে।